আজকের শীর্ষ খবর ডেস্ক:
পশ্চ্যাতপদ জনপথ মধুপুরে ফাদার হোমরিক এসেছিলেন ১৯৫৫ সালে।খ্রিস্টধর্ম প্রচারের পাশাপাশি নিরলসভাবে মানবকল্যাণে কাজ করে গেছেন দীৰ্ঘ ৬ দশক।এই ছয় দশকে শিক্ষা বিস্তারে অতুলনীয় অবদান, মুক্তিযুদ্ধের সময় অসামান্য অবদানের জন্য মধুপুরের মানুষের মনের খুব গভীরে স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি।আমেরিকার নাগরিক হয়েও যিনি মনেপ্রাণে একজন খাঁটি বাঙালি হয়ে গিয়েছিলেন।ফাদার ইউজিন হোমরিক গত ১৩ আগস্ট ২০১৬সালে নীরবেই মধুপুর তথা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তার জন্মভূমি যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যে। সেখানেই তিনি বসবাস করছিলেন। মাত্র কয়েকদিন আগে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসারত ছিলেন।আজ তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন।মধুপুরবাসী ফেইসবুক গ্রুপের পক্ষ থেকে ফাদার হোমরিকের মৃত্যূতে বিনম্র শ্রদ্ধা ও শোক প্রকাশ করছি।
প্রচার বিমুখ এই মহান মানুষটির সম্পর্কে মধুপুরের বর্তমান প্রজন্ম তেমন কিছুই জানেন না। যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময়টুকু মধুপুর গড়ের শালবনের সঙ্গে গভীর মিতালি করে কাটিয়ে দিয়েছেন ৬ যুগ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমেরিকা বিরোধিতা করলেও তিনি আমেরিকান নাগরিক হয়েও মুক্তি পাগল জনতাকে সাহায্য সহযোগিতা দিয়েছেন ধরেছেন অস্ত্র। শুধু তাই না আজকের আধুনিক সুশিক্ষিত গারো জাতি গড়ে তোলার পিছনে তাঁর অবদান অসাধারণ।
রেভারেন্ড ফাদার ইউজিন হোমরিক সিএসসি ১৯২৮ সালের ৮ ডিসেম্বর আমেরিকার মিসিগান অঙ্গরাজ্যে জন্ম গ্রহণ করেন। তার কঠোর পরিশ্রমী পিতা ৬ সন্তানকেই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত গড়ে তোলেন। হোমরিক আমেরিকান ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ওয়াশিংটন ডিসি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪ বছর মেয়াদি ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। সেখানে তিনি নিজ ধর্মের পাশাপাশি ইসলাম, বৌদ্ধ ও হিন্দু র্ধেমর ওপর বিশদ জ্ঞান অর্জন করেন।
ফাদার ইউজিন হোমরিক ১৯৫৫ সালে হলিক্রস মিশনারি হিসেবে বাংলাদেশে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আগমন করেন। মধুপুর শালবন যখন গহিন অরণ্য, বাঘ, ভালুক, হরিণ, হাতি ও বন্যপ্রানীতে ভরপুর। দুর্ভেদ্য এ বনে তখন ধর্ম প্রচার করতে আসেন তিনি। তখন এ এলাকার গারোরা ছিল বেশির ভাগই সাংসারেক ধর্মে অনুসারী। ফাদার ইউজিন হোমরিক এখানে হিংস্র বন্যপ্রাণীদের সঙ্গে যুদ্ধ করে জীবনবাজি রেখে গড় এলাকার জলছত্র নামক স্থানে আস্তানা গড়েন। হাওদা বিলের স্বচ্ছ জল আর শাল গজারির মৌ মৌ গন্ধে কাটতে থাকে দিন। প্রকৃতি প্রেমি এ মানুষটি ধীরে ধীরে জলছত্র গ্রামের আশপাশে ঘুরে ঘুরে প্রকৃতি উপভোগ করেন। তখন জনসংখ্যা ছিল একেবারে কম। প্রতিবেশী গারোদের সঙ্গে গড়ে ওঠে তার সখ্যতা। টাঙ্গাইল ময়মনসিংহ সড়কের পঁচিশ মাইল নামক স্থানে স্থানীয় গারোদের সঙ্গে নিয়ে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারের কাজ শুরু করেন। মিশনে গারোদের যাতায়াত বাড়তে থাকে। সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন ফাদার হোমরিক। এভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তার ধর্ম প্রচারের কাজ। মানবতার সেবায় তিনি এগিয়ে যান দ্রুত গতিতে।
যুদ্ধকালীন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা, শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধা ও নিরস্ত্র বাঙালিদের তিনি সহায়তা করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জন্য যাঁরা বিশেষ অবদান রেখেছিলেন, সেই বিদেশি বন্ধুদের বাংলাদেশ সরকার বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেছেন। এই নিঃস্বার্থ বিদেশি বন্ধুটি ২০১২ সালে সেই সম্মাননায় সম্মানিত হয়েছেন।
মো: জাহিদুল ইসলাম রনি
জানালপুর জেলা প্রতিনিধি
স্বপ্ন সারথীর চির বিদায় ফাদার ইউজিন হোমরিক আর নেই।
Location:
Bangladesh

Post a Comment