পাঁচ বছর বয়সী একমাত্র ছেলে বন্য হাতি দেখতে চায়। পড়ন্ত বিকেলে দাহাপাড়া বাদামবাড়ী পাহাড়ের চুড়ায় একটি বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ভয়াবহ রূপবতী ষোড়শী এক মেয়ে কাঠের পুরাতন ভাঙ্গা দু’তলা বারান্দা থেকে জানতে চাইল কাকে চাই, কোথা থেকে এসেছেন ? আমাদের নিকট মনে হয়েছে, যেন প্রিন্সেস ডায়না! সহকর্মী শিখর হাজং এর ঘোর এখনো কাটেনি। ডায়না আবারো প্রশ্নের পূণরাবৃত্তি করায় শিখর হাজং সম্বিত ফিরে পায় এবং হাজং ভাষায় উত্তর দেয় “কলেজলা প্রিন্সিপালি স্যার দাদা লগন দিখা করিবাগে চায়। দাদাগে কি ডাককে দিওয়া যাব?” ভাষার জাতীয়তায় মেয়েটি নিরাপদ বোধ :করে, ঘরের নিচ তলার একটি কক্ষে আমাদের বসতে বলে। কিছুক্ষপর অশীতিপর এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমাদের পাশে এসে বসলেন। সামাজিকতা শেষে হাতি দেখতে গিয়ে আমরা সুসঙ্গ এর ঐতিহাসিক যোদ্ধা অসীম সাহসী নায়ক মনা সরদার সম্পর্কে জানতে চাই। তিনি বলতে লাগলেন- সুসঙ্গ, আলাপ সিং, ভাওয়াল ও হাজরাদীর জমিদারগণ বন্য হাতির উপদ্রব থেকে পরিত্রান পাওয়ার জন্য প্রতিকার চেয়ে আবেদন করায় ইংরেজ সরকার খেদা (ঘের) স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। খেদা স্থাপন ছিল ব্যয় বহুল তারপরও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এক সময় ১৭৮৯ খ্রিঃ খেদা আইন বিধিবদ্ধ হয়। ইতিহাস থেকে জানা যায় সোমেশ্বর পাঠক মসনদ-ই-আলা ঈশা খা’র অন্যতম সেনাধ্যক্ষ ছিলেন। সোমেশ্বর পাঠকের সতীর্থ যাত্রী সুসঙ্গী মর্মার্থের নামে রাজ্যের নাম হয় সুসঙ্গ। ১২৮০ সালে সহজ সরল প্রতাশালী বৈশ্য গারো রাজার পরাজয়ের মাধ্যমে স্বাধীন রাজ্য সোমেশ্বর পাঠকের অধীনস্ত হয়। তিনি ছিলেন সুসঙ্গ মুল্লুকের প্রথম রাজ পুরুষ। সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর সুসঙ্গ এর কমলা রানী সাগর দিঘির প্রাণ পুরুষ জানকী নাথের ছেলে রঘুনাথ দিল্লির শাসনের অধীনতা স্বীকার করলে তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীর কর্তৃক মহারাজা উপাধীতে ভূষিত হন, যা তার পরবর্তী পর্যাক্রমিক বংশধর ভুপেন্দ্র চন্দ্র সিংহ শর্মা পর্যন্ত টেকসই হয়।
হাতি ধরার জন্য সুসঙ্গ এর রাজা কিশোর সিংহ আশেপাশের অঞ্চল থেকে অনেক হাজং পরিবারকে গারো পাহাড়ের পাদদেশে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। একটা সময় ছিল যখন যুদ্ধ এবং যুদ্ধ সরঞ্জাম সরবরাহে হাতি ব্যবহার করা হত। তখন হাতির ব্যবসা ছিল লাভ জনক। অন্যান্য জমিদারদের সাথে সুসঙ্গ জমিদারগণ দিল্লি, মুর্শিদাবাদ, ঢাকায় হাতি বিক্রয় করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতেন। সুসঙ্গ সীমান্তবর্তী মেঘালয় আসাম পার্বত্যাঞ্চল থেকে সমতল ভূমিতে নেমে আসত অসংখ্য বন্য হাতি। এসব হাতি স্বাধীন ভাবে বিচরণ করত। স্থানীয় জমিদারা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত হাজং, গারো গোষ্ঠীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর জবরদস্তি করে তাদেরকে দিয়ে খেদা তৈরি করে হাতি ধরার কাজে নিয়োজিত রাখত। হাতি ধরার জন্য হাজংদের কোন পারিশ্রমিক দেয়া হতো না। তাছাড়া খেদা দিয়ে হাতি ধরার সময় কেউ কেউ মারা যেত। যেসব হাজং ভয়ে এ কাজ থেকে বিরত থাকতো তাদের উপর রাজাদের অত্যাচারের সীমা ছাড়িয়ে যেত।
দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় হাজংরা মুক্তির স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। জন্ম হয় মনা সরদারের নেতৃত্বে সংশপ্তক এক বিদ্রোহী বাহিনী। সুসঙ্গ রাজা বিশ্বনাথ এ বিদ্রোহের খবর শুনে ক্ষেপে যায়। একদিন পাহাড় সন্নিকট বারমারী লক্ষিপুর নামক স্থানে পাইক পেয়াদাদের সাথে মনা সর্দার বাহিনীর যুদ্ধ বেধে যায়। মনা সর্দার বাহিনী সুসঙ্গ রাজ্যের সীমান্তবর্তী সবকটি হাতি খেদা ধ্বংস করে দিয়ে যখন আক্রমনের জন্য সুসঙ্গ রাজবাড়িতে প্রবেশ করে তখন রাজ পরিবার প্রাণ বাচাঁনোর জন্য কালীগঞ্জ (নেত্রকোনা)-এ আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে কৌশল এবং অর্থনৈতিক শক্তি নিয়ে আবারো রাজা বিশ্বনাথ সিংহ তার সুসঙ্গ রাজ্যের বাড়ি ফিরে আসে এবং অঙ্গীকার করে তারা হাতি খেদা আইন শীঘ্রই রহিতের ব্যবস্থা করে এ ব্যবসা ছেড়ে দেবে। কিন্তু বিদ্রোহের রেশ থেকে যায়। মনা সর্দারকে কিছুদিন পর রাজা কৌশলে আটক করে। এই কৌশলে কলমাকান্দার লাঠিয়াল বাহিনী অগ্রনী ভূমিকা নেয়। এ সময় হত্যা করা হয় মংলা হাজং, বিহারী হাজং, বাঘা হদিসহ নাম নাজানা আরো অনেকেই। তংলু, মলা, গয়া মড়লও নিখোজ হয়। বুনো হাতির পদতলে পিষ্ট করে পৌষ মাসের ০৪ তারিখ ১২২৭বাংলা সন মোতাবেক ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দে আটককৃত মনা সর্দারকে নৃ-শংস ভাবে হত্যা করা হয়। ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে মহারাজা কুমুদ চন্দ্রের পিতা কমল কৃষ্ণ চন্দ্র তার পূর্ব পুরুষের অঙ্গীকার রক্ষা কল্পে হাতি খেদা আইন রহিত করতে ব্রিটিশ সরকারকে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানায় এবং হাতি খেদা/ঘের আইন রহিত হয়।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বৃংহতির পাশাপাশি মানুষের ঘন্টা বাজানোর শব্দও শোনা যাচ্ছে। সাথে থাকা টর্চ লাইট এর আলোতে বাদামবাড়ীর উচু পাহাড়ের মাচা ঘরের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি বাচ্চা সমেত বন্য হাতির ছোট একটা দল ধান ক্ষেতে নেমেছে। মনা সর্দারের হাতি ঘের আন্দোলনের পূর্ণতায় স্বাধীনতার গল্পে আমি তৃপ্ত, মুগ্ধ। বৃদ্ধার নিকট থেকে বিদায় নিয়ে শিখর হাজংকে ল্যাপটপ গোছাতে বলি। অবাক কান্ড! হয়ত শিখর কিছুই টাইপ করেনি। খেয়াল করছি, মনা সর্দারের ঘেরের গল্প শেষ হলেও শিখর হাজং এর ঘোর এখনো কাটেনি। —কিসের ঘোর? শেকড়ের টান নাকি মায়াবতী ডায়নার!
হাতি খেদা’য় মনা সর্দার -ফারুক আহমেদ তালুকদার
আজকের শীর্ষ খবর ডেস্ক:
পাঁচ বছর বয়সী একমাত্র ছেলে বন্য হাতি দেখতে চায়। পড়ন্ত বিকেলে দাহাপাড়া বাদামবাড়ী পাহাড়ের চুড়ায় একটি বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ভয়াবহ রূপবতী ষোড়শী এক মেয়ে কাঠের পুরাতন ভাঙ্গা দু’তলা বারান্দা থেকে জানতে চাইল কাকে চাই, কোথা থেকে এসেছেন ? আমাদের নিকট মনে হয়েছে, যেন প্রিন্সেস ডায়না! সহকর্মী শিখর হাজং এর ঘোর এখনো কাটেনি। ডায়না আবারো প্রশ্নের পূণরাবৃত্তি করায় শিখর হাজং সম্বিত ফিরে পায় এবং হাজং ভাষায় উত্তর দেয় “কলেজলা প্রিন্সিপালি স্যার দাদা লগন দিখা করিবাগে চায়। দাদাগে কি ডাককে দিওয়া যাব?” ভাষার জাতীয়তায় মেয়েটি নিরাপদ বোধ :করে, ঘরের নিচ তলার একটি কক্ষে আমাদের বসতে বলে। কিছুক্ষপর অশীতিপর এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমাদের পাশে এসে বসলেন। সামাজিকতা শেষে হাতি দেখতে গিয়ে আমরা সুসঙ্গ এর ঐতিহাসিক যোদ্ধা অসীম সাহসী নায়ক মনা সরদার সম্পর্কে জানতে চাই। তিনি বলতে লাগলেন- সুসঙ্গ, আলাপ সিং, ভাওয়াল ও হাজরাদীর জমিদারগণ বন্য হাতির উপদ্রব থেকে পরিত্রান পাওয়ার জন্য প্রতিকার চেয়ে আবেদন করায় ইংরেজ সরকার খেদা (ঘের) স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। খেদা স্থাপন ছিল ব্যয় বহুল তারপরও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এক সময় ১৭৮৯ খ্রিঃ খেদা আইন বিধিবদ্ধ হয়। ইতিহাস থেকে জানা যায় সোমেশ্বর পাঠক মসনদ-ই-আলা ঈশা খা’র অন্যতম সেনাধ্যক্ষ ছিলেন। সোমেশ্বর পাঠকের সতীর্থ যাত্রী সুসঙ্গী মর্মার্থের নামে রাজ্যের নাম হয় সুসঙ্গ। ১২৮০ সালে সহজ সরল প্রতাশালী বৈশ্য গারো রাজার পরাজয়ের মাধ্যমে স্বাধীন রাজ্য সোমেশ্বর পাঠকের অধীনস্ত হয়। তিনি ছিলেন সুসঙ্গ মুল্লুকের প্রথম রাজ পুরুষ। সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর সুসঙ্গ এর কমলা রানী সাগর দিঘির প্রাণ পুরুষ জানকী নাথের ছেলে রঘুনাথ দিল্লির শাসনের অধীনতা স্বীকার করলে তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীর কর্তৃক মহারাজা উপাধীতে ভূষিত হন, যা তার পরবর্তী পর্যাক্রমিক বংশধর ভুপেন্দ্র চন্দ্র সিংহ শর্মা পর্যন্ত টেকসই হয়।
হাতি ধরার জন্য সুসঙ্গ এর রাজা কিশোর সিংহ আশেপাশের অঞ্চল থেকে অনেক হাজং পরিবারকে গারো পাহাড়ের পাদদেশে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। একটা সময় ছিল যখন যুদ্ধ এবং যুদ্ধ সরঞ্জাম সরবরাহে হাতি ব্যবহার করা হত। তখন হাতির ব্যবসা ছিল লাভ জনক। অন্যান্য জমিদারদের সাথে সুসঙ্গ জমিদারগণ দিল্লি, মুর্শিদাবাদ, ঢাকায় হাতি বিক্রয় করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতেন। সুসঙ্গ সীমান্তবর্তী মেঘালয় আসাম পার্বত্যাঞ্চল থেকে সমতল ভূমিতে নেমে আসত অসংখ্য বন্য হাতি। এসব হাতি স্বাধীন ভাবে বিচরণ করত। স্থানীয় জমিদারা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত হাজং, গারো গোষ্ঠীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর জবরদস্তি করে তাদেরকে দিয়ে খেদা তৈরি করে হাতি ধরার কাজে নিয়োজিত রাখত। হাতি ধরার জন্য হাজংদের কোন পারিশ্রমিক দেয়া হতো না। তাছাড়া খেদা দিয়ে হাতি ধরার সময় কেউ কেউ মারা যেত। যেসব হাজং ভয়ে এ কাজ থেকে বিরত থাকতো তাদের উপর রাজাদের অত্যাচারের সীমা ছাড়িয়ে যেত।
দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় হাজংরা মুক্তির স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। জন্ম হয় মনা সরদারের নেতৃত্বে সংশপ্তক এক বিদ্রোহী বাহিনী। সুসঙ্গ রাজা বিশ্বনাথ এ বিদ্রোহের খবর শুনে ক্ষেপে যায়। একদিন পাহাড় সন্নিকট বারমারী লক্ষিপুর নামক স্থানে পাইক পেয়াদাদের সাথে মনা সর্দার বাহিনীর যুদ্ধ বেধে যায়। মনা সর্দার বাহিনী সুসঙ্গ রাজ্যের সীমান্তবর্তী সবকটি হাতি খেদা ধ্বংস করে দিয়ে যখন আক্রমনের জন্য সুসঙ্গ রাজবাড়িতে প্রবেশ করে তখন রাজ পরিবার প্রাণ বাচাঁনোর জন্য কালীগঞ্জ (নেত্রকোনা)-এ আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে কৌশল এবং অর্থনৈতিক শক্তি নিয়ে আবারো রাজা বিশ্বনাথ সিংহ তার সুসঙ্গ রাজ্যের বাড়ি ফিরে আসে এবং অঙ্গীকার করে তারা হাতি খেদা আইন শীঘ্রই রহিতের ব্যবস্থা করে এ ব্যবসা ছেড়ে দেবে। কিন্তু বিদ্রোহের রেশ থেকে যায়। মনা সর্দারকে কিছুদিন পর রাজা কৌশলে আটক করে। এই কৌশলে কলমাকান্দার লাঠিয়াল বাহিনী অগ্রনী ভূমিকা নেয়। এ সময় হত্যা করা হয় মংলা হাজং, বিহারী হাজং, বাঘা হদিসহ নাম নাজানা আরো অনেকেই। তংলু, মলা, গয়া মড়লও নিখোজ হয়। বুনো হাতির পদতলে পিষ্ট করে পৌষ মাসের ০৪ তারিখ ১২২৭বাংলা সন মোতাবেক ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দে আটককৃত মনা সর্দারকে নৃ-শংস ভাবে হত্যা করা হয়। ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে মহারাজা কুমুদ চন্দ্রের পিতা কমল কৃষ্ণ চন্দ্র তার পূর্ব পুরুষের অঙ্গীকার রক্ষা কল্পে হাতি খেদা আইন রহিত করতে ব্রিটিশ সরকারকে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানায় এবং হাতি খেদা/ঘের আইন রহিত হয়।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বৃংহতির পাশাপাশি মানুষের ঘন্টা বাজানোর শব্দও শোনা যাচ্ছে। সাথে থাকা টর্চ লাইট এর আলোতে বাদামবাড়ীর উচু পাহাড়ের মাচা ঘরের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি বাচ্চা সমেত বন্য হাতির ছোট একটা দল ধান ক্ষেতে নেমেছে। মনা সর্দারের হাতি ঘের আন্দোলনের পূর্ণতায় স্বাধীনতার গল্পে আমি তৃপ্ত, মুগ্ধ। বৃদ্ধার নিকট থেকে বিদায় নিয়ে শিখর হাজংকে ল্যাপটপ গোছাতে বলি। অবাক কান্ড! হয়ত শিখর কিছুই টাইপ করেনি। খেয়াল করছি, মনা সর্দারের ঘেরের গল্প শেষ হলেও শিখর হাজং এর ঘোর এখনো কাটেনি। —কিসের ঘোর? শেকড়ের টান নাকি মায়াবতী ডায়নার!
পাঁচ বছর বয়সী একমাত্র ছেলে বন্য হাতি দেখতে চায়। পড়ন্ত বিকেলে দাহাপাড়া বাদামবাড়ী পাহাড়ের চুড়ায় একটি বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ভয়াবহ রূপবতী ষোড়শী এক মেয়ে কাঠের পুরাতন ভাঙ্গা দু’তলা বারান্দা থেকে জানতে চাইল কাকে চাই, কোথা থেকে এসেছেন ? আমাদের নিকট মনে হয়েছে, যেন প্রিন্সেস ডায়না! সহকর্মী শিখর হাজং এর ঘোর এখনো কাটেনি। ডায়না আবারো প্রশ্নের পূণরাবৃত্তি করায় শিখর হাজং সম্বিত ফিরে পায় এবং হাজং ভাষায় উত্তর দেয় “কলেজলা প্রিন্সিপালি স্যার দাদা লগন দিখা করিবাগে চায়। দাদাগে কি ডাককে দিওয়া যাব?” ভাষার জাতীয়তায় মেয়েটি নিরাপদ বোধ :করে, ঘরের নিচ তলার একটি কক্ষে আমাদের বসতে বলে। কিছুক্ষপর অশীতিপর এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমাদের পাশে এসে বসলেন। সামাজিকতা শেষে হাতি দেখতে গিয়ে আমরা সুসঙ্গ এর ঐতিহাসিক যোদ্ধা অসীম সাহসী নায়ক মনা সরদার সম্পর্কে জানতে চাই। তিনি বলতে লাগলেন- সুসঙ্গ, আলাপ সিং, ভাওয়াল ও হাজরাদীর জমিদারগণ বন্য হাতির উপদ্রব থেকে পরিত্রান পাওয়ার জন্য প্রতিকার চেয়ে আবেদন করায় ইংরেজ সরকার খেদা (ঘের) স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। খেদা স্থাপন ছিল ব্যয় বহুল তারপরও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এক সময় ১৭৮৯ খ্রিঃ খেদা আইন বিধিবদ্ধ হয়। ইতিহাস থেকে জানা যায় সোমেশ্বর পাঠক মসনদ-ই-আলা ঈশা খা’র অন্যতম সেনাধ্যক্ষ ছিলেন। সোমেশ্বর পাঠকের সতীর্থ যাত্রী সুসঙ্গী মর্মার্থের নামে রাজ্যের নাম হয় সুসঙ্গ। ১২৮০ সালে সহজ সরল প্রতাশালী বৈশ্য গারো রাজার পরাজয়ের মাধ্যমে স্বাধীন রাজ্য সোমেশ্বর পাঠকের অধীনস্ত হয়। তিনি ছিলেন সুসঙ্গ মুল্লুকের প্রথম রাজ পুরুষ। সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর সুসঙ্গ এর কমলা রানী সাগর দিঘির প্রাণ পুরুষ জানকী নাথের ছেলে রঘুনাথ দিল্লির শাসনের অধীনতা স্বীকার করলে তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীর কর্তৃক মহারাজা উপাধীতে ভূষিত হন, যা তার পরবর্তী পর্যাক্রমিক বংশধর ভুপেন্দ্র চন্দ্র সিংহ শর্মা পর্যন্ত টেকসই হয়।
হাতি ধরার জন্য সুসঙ্গ এর রাজা কিশোর সিংহ আশেপাশের অঞ্চল থেকে অনেক হাজং পরিবারকে গারো পাহাড়ের পাদদেশে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। একটা সময় ছিল যখন যুদ্ধ এবং যুদ্ধ সরঞ্জাম সরবরাহে হাতি ব্যবহার করা হত। তখন হাতির ব্যবসা ছিল লাভ জনক। অন্যান্য জমিদারদের সাথে সুসঙ্গ জমিদারগণ দিল্লি, মুর্শিদাবাদ, ঢাকায় হাতি বিক্রয় করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতেন। সুসঙ্গ সীমান্তবর্তী মেঘালয় আসাম পার্বত্যাঞ্চল থেকে সমতল ভূমিতে নেমে আসত অসংখ্য বন্য হাতি। এসব হাতি স্বাধীন ভাবে বিচরণ করত। স্থানীয় জমিদারা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত হাজং, গারো গোষ্ঠীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর জবরদস্তি করে তাদেরকে দিয়ে খেদা তৈরি করে হাতি ধরার কাজে নিয়োজিত রাখত। হাতি ধরার জন্য হাজংদের কোন পারিশ্রমিক দেয়া হতো না। তাছাড়া খেদা দিয়ে হাতি ধরার সময় কেউ কেউ মারা যেত। যেসব হাজং ভয়ে এ কাজ থেকে বিরত থাকতো তাদের উপর রাজাদের অত্যাচারের সীমা ছাড়িয়ে যেত।
দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় হাজংরা মুক্তির স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। জন্ম হয় মনা সরদারের নেতৃত্বে সংশপ্তক এক বিদ্রোহী বাহিনী। সুসঙ্গ রাজা বিশ্বনাথ এ বিদ্রোহের খবর শুনে ক্ষেপে যায়। একদিন পাহাড় সন্নিকট বারমারী লক্ষিপুর নামক স্থানে পাইক পেয়াদাদের সাথে মনা সর্দার বাহিনীর যুদ্ধ বেধে যায়। মনা সর্দার বাহিনী সুসঙ্গ রাজ্যের সীমান্তবর্তী সবকটি হাতি খেদা ধ্বংস করে দিয়ে যখন আক্রমনের জন্য সুসঙ্গ রাজবাড়িতে প্রবেশ করে তখন রাজ পরিবার প্রাণ বাচাঁনোর জন্য কালীগঞ্জ (নেত্রকোনা)-এ আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে কৌশল এবং অর্থনৈতিক শক্তি নিয়ে আবারো রাজা বিশ্বনাথ সিংহ তার সুসঙ্গ রাজ্যের বাড়ি ফিরে আসে এবং অঙ্গীকার করে তারা হাতি খেদা আইন শীঘ্রই রহিতের ব্যবস্থা করে এ ব্যবসা ছেড়ে দেবে। কিন্তু বিদ্রোহের রেশ থেকে যায়। মনা সর্দারকে কিছুদিন পর রাজা কৌশলে আটক করে। এই কৌশলে কলমাকান্দার লাঠিয়াল বাহিনী অগ্রনী ভূমিকা নেয়। এ সময় হত্যা করা হয় মংলা হাজং, বিহারী হাজং, বাঘা হদিসহ নাম নাজানা আরো অনেকেই। তংলু, মলা, গয়া মড়লও নিখোজ হয়। বুনো হাতির পদতলে পিষ্ট করে পৌষ মাসের ০৪ তারিখ ১২২৭বাংলা সন মোতাবেক ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দে আটককৃত মনা সর্দারকে নৃ-শংস ভাবে হত্যা করা হয়। ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে মহারাজা কুমুদ চন্দ্রের পিতা কমল কৃষ্ণ চন্দ্র তার পূর্ব পুরুষের অঙ্গীকার রক্ষা কল্পে হাতি খেদা আইন রহিত করতে ব্রিটিশ সরকারকে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানায় এবং হাতি খেদা/ঘের আইন রহিত হয়।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বৃংহতির পাশাপাশি মানুষের ঘন্টা বাজানোর শব্দও শোনা যাচ্ছে। সাথে থাকা টর্চ লাইট এর আলোতে বাদামবাড়ীর উচু পাহাড়ের মাচা ঘরের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি বাচ্চা সমেত বন্য হাতির ছোট একটা দল ধান ক্ষেতে নেমেছে। মনা সর্দারের হাতি ঘের আন্দোলনের পূর্ণতায় স্বাধীনতার গল্পে আমি তৃপ্ত, মুগ্ধ। বৃদ্ধার নিকট থেকে বিদায় নিয়ে শিখর হাজংকে ল্যাপটপ গোছাতে বলি। অবাক কান্ড! হয়ত শিখর কিছুই টাইপ করেনি। খেয়াল করছি, মনা সর্দারের ঘেরের গল্প শেষ হলেও শিখর হাজং এর ঘোর এখনো কাটেনি। —কিসের ঘোর? শেকড়ের টান নাকি মায়াবতী ডায়নার!
Post a Comment